সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বিতর্কের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বিতর্কের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

ড. মো. আবু হাসান

বেতন-বিতর্ক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন:
দীর্ঘ এক দশক পর সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং বেতন-কাঠামো নিয়ে একটি তীব্র ও মেরুকৃত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান কাঠামোর তুলনায় ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবটি রাষ্ট্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি কর্মচারীদের প্রকৃত আয়কে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। গত এক দশকে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ৮–১০ শতাংশের ঘরে থাকায় তৈরি হয়েছে এক দ্বিমাত্রিক বাস্তবতা: একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে প্রকৃত মজুরির ধারাবাহিক অবক্ষয়। কাগজে-কলমে বেতন একই থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এটি বাস্তবে একটি নীরব বেতন হ্রাসে পরিণত হয়েছে। এই ক্রান্তিলগ্নে ৯ম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশটি কেবল একটি আর্থিক দাবি নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক বঞ্চনার একটি যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।
পে–কমিশনের সুপারিশের পর জনপরিসরে সেই পুরোনো বাজার–নির্ভর এবং নিও–লিবারেল যুক্তিটি ফিরে এসেছে: বেসরকারি খাতের মতো সরকারি বেতনকেও কেন উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মাপা হবে না? এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, ‘যে বেতন জনগণের করের টাকায় দেওয়া হয়, তার বৃদ্ধিতে জনগণের সায় আছে কি?’ এই প্রশ্নগুলো আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসংগত মনে হলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় এখানে স্পষ্ট পদ্ধতিগত ভুল রয়েছে। এই নিবন্ধটি তাই চলমান বিতর্কের গভীরে নেমে দেখাতে চায় যে, কেন এই প্রশ্নগুলোকে কেবল বেতনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা ও প্রণোদনা-কাঠামোর আলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি। মূলত রাষ্ট্র কী ধরনের প্রণোদনা-ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় এবং কোন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রকল্পের সেবা করতে চায়, সেই বৃহত্তর মৌলিক প্রশ্ন থেকেই এই আলোচনার সূচনা হওয়া প্রয়োজন।

কেন বেসরকারি খাতের তুলনা তাত্ত্বিকভাবে ভ্রান্ত?
রাষ্ট্র কোনো ‘মুনাফা-সর্বোচ্চকরণকারী’ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। বেসরকারি খাতের মালিকপক্ষ হলো মুষ্টিমেয় শেয়ারহোল্ডার, যাদের লক্ষ্য নিছক আর্থিক মুনাফা। সেখানে পারফরম্যান্স মাপা সহজ, বিক্রয় কত, আয় কত বাড়ল বা খরচ কত কমল। কিন্তু রাষ্ট্র একটি সার্বভৌম সত্তা এবং সমষ্টিগত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি–দাতা, যার মূল কাজ হলো জননিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মৌলিক সেবা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ডগলাস নর্থ (১৯৯০) রাষ্ট্রকে এমন এক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা ‘খেলার নিয়ম’ তৈরি করে; অর্থাৎ এমন আইন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে যার ভেতর দিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজ পরিচালিত হয়। বাজার যখন ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্র তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। সুতরাং, যে প্রতিষ্ঠান বাজারের ব্যর্থতা ঢাকতে কাজ করে, তাকে বাজারের মুনাফা-ভিত্তিক মাপকাঠিতে বিচার করা তাত্ত্বিকভাবেই বিভ্রান্তিকর।
থানায় অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া, আদালতে ন্যায় বিচার, সরকারি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা কিংবা দুর্যোগকালীন ত্রাণ–ব্যবস্থা; এসব জনসেবার উৎপাদনশীলতা বাজারের ইউনিট–প্রডাক্ট বা তাৎক্ষণিক মুনাফার ভাষায় মাপা যায় না। একজন পুলিশ অফিসার কতটি অপরাধ প্রতিরোধ করলেন বা একজন শিক্ষক কতজন সুনাগরিক গড়লেন, তার সুফল বাজার-দামে দৃশ্যমান নয়; কিন্তু এগুলো ঠিকমতো না পেলে পুরো অর্থনীতি ও সমাজে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়, তার অঙ্ক মাপা প্রায় অসম্ভব। নর্থ, ওয়ালিস ও উইংগাস্ট (২০০৯) দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো ‘সীমিত প্রবেশাধিকার–যুক্ত’ রাষ্ট্রে আইন ও নিয়ম সংগঠিত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থেই বেশি কাজ করে। তাই একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র, পেশাদার গণকর্মচারী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে অতিরিক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও প্রণোদনা দিতে হয়, নইলে সে দ্রুতই অলিগার্কিক স্বার্থের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে।
এখানেই ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আসে। বেসরকারি খাতে কর্মীরা ‘এক্সিট অপশন’ ব্যবহার করতে পারেন, অর্থাৎ বেতন পছন্দ না হলে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সরকারি চাকুরিজীবীরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাদের বদলি, কঠোর নিয়ম, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং ধর্মঘট না করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া তাদের প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়। এই অতিরিক্ত ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার অন্তত আংশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ বেতন–কাঠামো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও নীতিগত দায়িত্ব। অন্যথায়, ‘জনগণের ট্যাক্স বাঁচানোর’ দোহাই দিয়ে যদি মেধাবীদের নিম্ন মজুরিতে আটকে রাখা হয়, তবে সেটি শুধুই ব্যয় সাশ্রয় নয়; তা আসলে এমন এক নেতিবাচক প্রণোদনা–কাঠামো তৈরি করে, যেখানে সৎ মানুষের জন্য সরকারি সেবা–খাতে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিণতি হলো, রাষ্ট্রের এজেন্টরা বৈধ বেতনের বদলে অনানুষ্ঠানিক ‘রেন্ট’, ঘুষ ও এলিট–নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র আরও বেশি অলিগার্কিক দখলের মধ্যে চলে যায়।

জনপরিসরের আপত্তি ও প্রতিতর্ক:
সরকারি বেতন বৃদ্ধির আলোচনায় জনপরিসরে যে তীব্র মেরুকরণ দেখা যায়, তাকে কেবল আবেগ বা সাময়িক ক্ষোভ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদের কাছে এটি আসলে গভীর কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র, আমলাতন্ত্র এবং সাধারণ নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কিছু ভুল ধারণা কাজ করে। এই আপত্তিগুলোকে নিচের চারটি স্তরে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।


(১) মেধার অবমাননা ও নৈতিক স্ববিরোধিতা: জনপরিসরে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে যে, সরকারি অফিস যখন কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয় না, তখন বেতন বাড়িয়ে পুরস্কার দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? এখানে একটি মৌলিক তাত্ত্বিক ভুল রয়েছে। আমাদের সমাজ একদিকে দেশের সেরা মেধাবীদের কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে বেছে নেয়, আবার অন্যদিকে সেই মেধাবীদেরই দীর্ঘমেয়াদে একটি অমর্যাদাকর মজুরিতে আটকে রাখে। এটি একটি নীতিগত স্ববিরোধিতা। একদিকে তাদের ওপর উচ্চমানের সেবা ও সততার প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া হয়, অন্যদিকে তাদের জীবনযাত্রাকে ঠেলে দেওয়া হয় খাদের কিনারে। এর ফলে মেধাবীরা নৈতিকভাবে অপদস্থ বোধ করেন। এই নেতিবাচক প্রণোদনা কাঠামো শেষ পর্যন্ত যোগ্য মানুষকে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য করে এবং পুরো ব্যবস্থাকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে।


(২) হিংসার অপরায়ন ও কাঠামোগত বৈষম্য: সোশ্যাল মিডিয়া বা টকশোতে যে ক্ষোভ দেখা যায়, তার লক্ষ্যবস্তু সাধারণত হয় উচ্চপদস্থ অল্প কিছু আমলা। কিন্তু এই রাগের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের সেই বিশাল কর্মীবাহিনী যারা সংখ্যায় মোট সরকারি কর্মচারীর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। নাগরিক সেবার মূল ভারটি আসলে এই নিচের স্তরের কর্মীদের কাঁধেই থাকে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় একে হিংসার অপরায়ন নীতি বলা হয়। অর্থাৎ প্রকৃত ক্ষোভ যাদের দিকে যাওয়ার কথা ছিল যেমন করফাঁকিবাজ, ঋণখেলাপি বা অলিগার্কিক লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী; সেই ক্ষোভ সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দৃশ্যমান কিন্তু সীমিত দর-কষাকষি ক্ষমতার অধিকারী সরকারি নিম্ন-মধ্যবিত্তের দিকে। মুদ্রাস্ফীতির চাপে যারা আজ দরিদ্র নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে, তাদের জীবনযাপন সংকট উপেক্ষা করা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী।

(৩) মজুরি জাস্টিস ও জাতীয় মজুরি নীতি: প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক যে শুধু সরকারি বেতন কেন বাড়বে, সবার মজুরি কেন বাড়ছে না? এই প্রশ্নকে অবমূল্যায়ন না করে বরং একটি জাতীয় মজুরি নীতির প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা উচিত। সরকারি বেতন সমন্বয়কে কোনো একটি বিশেষ শ্রেণির লাভ হিসেবে না দেখে বরং একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে দেখা প্রয়োজন যা ধীরে ধীরে সব পেশায় প্রয়োগ করা উচিত। রাষ্ট্র যখন নিজের কর্মীদের জন্য একটি সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করতে পারবে, তখনই সে নৈতিকভাবে বেসরকারি খাতের ওপর মানবিক মজুরি নিশ্চিত করার চাপ দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। সবাই কষ্টে আছে তাই কারো বেতনই বাড়বে না এমন মানসিকতা কেবল বৈষম্যকেই স্থায়ী করে, কোনো সমাধান আনে না।

(৪) করের টাকা ও জনগণের সায়: বেতন বৃদ্ধির বিপক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হলো যে বেতন জনগণের করের টাকায় দেওয়া হয়, সেখানে জনগণের সম্মতি আছে কি না। এই আপত্তির উত্তর খুঁজতে হলে কর ও সেবার সামাজিক চুক্তিটি বুঝতে হবে। সাধারণ মানুষের মনে অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি হয় যে বেতন বাড়লে সরাসরি তাদের পকেট থেকে কর কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু নাগরিকের প্রকৃত অসন্তুষ্টি আসলে বেতনের অঙ্কের ওপর নয় বরং সেবার মানের ওপর। মানুষ কর দেয় বিনিময়ে নিরাপত্তা, বিচার ও নাগরিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায়। রাষ্ট্র যখন নিজের কর্মচারীদের উপযুক্ত মজুরি না দিয়ে তাদের অলিগার্কিক পক্ষাঘাতের দিকে ঠেলে দেয়, তখন নাগরিকরা দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমত তারা কর দিয়েও ভালো সেবা পায় না। দ্বিতীয়ত সেই একই সেবা পেতে তাদের আবার আলাদাভাবে ঘুষ বা উপঢৌকন দিতে হয়। অর্থাৎ একই সেবার জন্য নাগরিককে দুবার মূল্য দিতে হয়। সুতরাং করের টাকার সঠিক ব্যবহার হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়া যেখানে আমলাতন্ত্র সৎ এবং প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তিমূলক করে নাগরিককে হয়রানি ছাড়াই সেবা দিতে পারে। কর্মচারীদের ক্ষুধার্ত রেখে বাজেট বাঁচানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জন্য আরও যন্ত্রণাদায়ক হয় কারণ তখন ঘুষই হয়ে ওঠে অলিখিত দ্বিতীয় কর।

শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান এবং লুণ্ঠনের সংযোগ:

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমার বর্ণিত সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর একটি পদ্ধতিগত ফলাফল। এই কাঠামোতে রাষ্ট্রের দুটি বাহু বিশেষভাবে কেন্দ্রীয়; একটি হলো আমলাতন্ত্র, অন্যটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের সেবায় কাজ করবে নাকি অলিগার্কিক লুণ্ঠনের যন্ত্রে পরিণত হবে, তা মূলত এই দুই বাহুর চরিত্রের ওপর নির্ভর করে। ড্যারন এসেমগলু ও জেমস রবিনসন (২০১২) দেখিয়েছেন যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান সিংহভাগ নাগরিকের সুযোগকে বিস্তৃত করে, আর নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান মূলত ক্ষুদ্র এলিটগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন মুদ্রাস্ফীতির চাপে কর্মচারীদের প্রকৃত মজুরি কমে যায়, তখন সরকারি কর্মচারী ও আমলাতন্ত্রের ভেতরে এক ধরণের কাঠামোগত ক্ষুধা তৈরি হয়। এই আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে ধসিয়ে দিয়ে তাদের নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের একটি কার্যকর বাহুতে পরিণত করে। বেতন যখন জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত থাকে না, তখন গণকর্মচারী ও আমলাতন্ত্র নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের চেয়ে লুণ্ঠনকারী অলিগার্কদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় আমি যাকে সংজ্ঞায়িত করেছি অলিগার্কিক ক্যাপচার নামে।
তাত্ত্বিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো, যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিভিন্ন কমিশন হওয়া উচিত জনস্বার্থের প্রহরী। কিন্তু বাস্তবে তারা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে নীতি-আয়ত্তের শিকার। দশকব্যাপী ব্যাংকিং খাতের ঋণখেলাপি থেকে শুরু করে বাজার সিন্ডিকেট পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নীরবতা বা শিথিল তদারকি দেখা গেছে। নিম্ন বেতন সরাসরি এই নিষ্কাশনমূলক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করে, কারণ তদারকি সংস্থাগুলোর কর্মীরা লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠীর কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক সুবিধা নিতে প্রলুব্ধ হয়। অর্থাৎ, লৌহ কাঠামোর এই দুই বাহু মিলে এমন একটি অদৃশ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করে যার ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও সম্পদ একটি সংগঠিত লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে সরে যায়।


আমলাতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানের এই অবক্ষয় সপ্তভুজ কাঠামোর বাকি পাঁচটি বাহুর সাথে এক ভয়াবহ যোগসূত্র তৈরি করে। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, পরিবারতন্ত্র ও কাল্ট আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ ও আনুগত্যের রাজনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনে, ফলে মেধা ও পেশাদারিত্ব প্রান্তিক হয়ে পড়ে। লুটেরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আমলাদের বেতন-বহির্ভূত সুবিধা দিয়ে নিজেদের পক্ষে লাভজনক নীতি ও শিথিল তদারকি আদায় করে নেয়। মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী চক্র উন্নয়নের বয়ান তৈরি করে এই লুণ্ঠনকে আড়াল করে এবং সিস্টেমিক সমস্যাকে নিছক ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখায়। বিদেশি মিত্ররা অলিগার্কদের অর্থ পাচারে সহায়তা করে এবং এই নিষ্কাশনমূলক কাঠামোকেই আন্তর্জাতিক বৈধতা দেয়। অনানুষ্ঠানিক মাফিয়াতন্ত্র স্থানীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারিত্ব বজায় রাখে।

লুণ্ঠনতন্ত্রের অটো-পাইলট বনাম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার:
আমার গবেষণা রাজনৈতিক অর্থনীতির এই পদ্ধতিগত ব্যাধিকে বোঝার জন্য তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত কাঠামোগত প্যাথলজি চিহ্নিত করে, যা রাষ্ট্রকে একটি দুষ্টচক্রের আবর্তে বন্দি করেছে। প্রথমত, অলিগার্কির সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো, যা সুপরিকল্পিতভাবে নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, মানব পুঁজির কাঠামোগত অপচয়, যা আমলাতন্ত্রকে মেধাহীন ও মেরুদণ্ডহীন করে এই কাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। এবং তৃতীয়ত, স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য, যা জনমানসে এমন এক স্থায়ী হতাশা তৈরি করে যেন অলিগার্কিক শাসন ও নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানকেই মানুষ নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়। এই প্যাথলজিগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে তৈরি হয় এক ভয়াবহ ‘অলিগার্কিক অটো-পাইলট’ ব্যবস্থা। এখানে আর্থিকভাবে ক্ষুধার্ত গণকর্মচারী, রাজনৈতিকভাবে দখলকৃত আমলাতন্ত্র এবং নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ এমনভাবে একীভূত হয় যে, সাধারণ নাগরিকের স্বার্থ এই ব্যবস্থার কেন্দ্র থেকে চিরতরে ছিটকে পড়ে।
তাই এই সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোকে ভাঙতে হলে আমলাতন্ত্রের ‘কাঠামোগত ক্ষুধা’ দূর করা অপরিহার্য। আমাদের বুঝতে হবে, বেতন বৃদ্ধি কেবল একটি সাধারণ আর্থিক লেনদেন নয়; এটি আমলাতন্ত্রকে অলিগার্কদের পকেট থেকে বের করে এনে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অধীনে ফিরিয়ে আনার একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ। রাষ্ট্র যদি তার কর্মীদের মর্যাদাপূর্ণ মজুরি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সে আসলে পরোক্ষভাবে অলিগার্কদের হাতেই রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার চাবি তুলে দেয়।
সুতরাং, এই বেতন সমন্বয় কেবল কর্মচারীদের পাওনা বা অধিকার নয়, বরং লুণ্ঠন-চক্র ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষাঘাত ভাঙার একটি প্রাথমিক ও অনিবার্য শর্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল বেতন বাড়ালেই কি এই কাঠামোগত নৈরাশ্য দূর হবে? বেতন বাড়ালেই কি দুর্নীতি কমবে? কিংবা মুদ্রাস্ফীতির যে মরীচিকা আমাদের দেখানো হয়, তার আসল সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপটি কী? মানুষের উদ্ভাবনী সময় যখন জীবনযুদ্ধের কাছে জিম্মি থাকে, তখন রাষ্ট্র কীভাবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করবে? আমার প্রস্তাবিত সময়–তথ্য–জ্ঞানগত অলিগার্কিক পক্ষাঘাত প্যারাডাইমের আলোকে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে এই বিতর্কের নীতি–সংস্কার, টেম্পোরাল ক্যাপচার ও সামষ্টিক অর্থনীতি–সংক্রান্ত দিকগুলো বিশ্লেষণ করে নিবন্ধটির শেষাংশ নিয়ে ফিরছি আগামী পর্বে।

লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা, অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক
Email: hhafij@yahoo.com

SHARES

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

আরো পোস্টঃ