বিদায় হে সমর নায়ক || এ কে খন্দকার বীর উত্তম
ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ
১। আজ বার বার এই ছবিটি তাকিয়ে দেখছিলাম। কি সুন্দর নায়কোচিত চেহারা! হ্যাঁ, নায়কই তিনি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক। নয়মাস তিনি সামনে থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই যুদ্ধে প্রায় নয় লক্ষ মাবোন সম্ভ্রম হারিয়েছে, তিরিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছে। কিন্তু আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিনিধি কোথায়?
২। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে একটি টেবিল ও দুটি চেয়ার দেখা যায়। একটিতে জেনারেল নিয়াজি, অপরটিতে জেনারেল অরোরা। জেনারেল অরোরার ঠিক পেছনেই
দাঁড়িয়ে এ কে খন্দকার। তার জন্য একটি চেয়ারের ব্যবস্থা করা কি এতোই কঠিন ছিল? মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানি কোথায়? কেন তিনি এই সময় ঢাকায় থাকতে পারলেন না?
৩। মূলত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই পাক বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিক যুদ্ধ বিরতির জন্য ইয়াহিয়ার কাছে আবেদনও করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া সেই আবেদনে সাড়া না দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। কারণ, তার তো আর মাঠে এসে যুদ্ধ করা লাগছে না। মিত্র বাহিনীও বুঝে যায় যে, পাক বাহিনী দ্রুতই আত্মসমর্পণ করবে। এবং দুই বাহিনীর মধ্যে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া ও পাক বাহিনীর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনাও চলছে। আবার যুদ্ধও চলছে। এই অবস্থায় ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত কর্নেল ওসমানীকে নিয়ে সিলেটে যাওয়ার কারণ কি?
৪। ওদিকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জেনারেল অরোরা কলকাতার দমদম এয়ারপোর্ট থেকে বিমানযোগে আগরতলা যান। আগরতলা থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসেন। তারপর একটি জিপে বসে রেসকোর্স ময়দানে আসেন। যা হোক, কলকাতা থেকে আগরতলা হয়ে জেনারেল অরোরা ঢাকা আসতে পারলেও কর্নেল ওসমানী সিলেট থেকে কেন ঢাকায় আসতে পারলেন না?
৫। এই বিশ্বে এক দেশের সাথে আরেক দেশের যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পণের ঘটনা একেবারে কম নয়। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আত্মসমর্পণের ঘটনা একেবারেই ব্যতিক্রম। যে দেশ তিরিশ লক্ষ শহিদ ও নয় লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে, সেই দেশের বিজয়ের অনুষ্ঠানে, শত্রুপক্ষের আত্মসমর্পণের সময়ে বিজয়ী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক উপস্থিত থাকবেন এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন তিনি থাকতে পারলেন না? মূলত এই ছোট্ট শিশু রাষ্ট্রের জন্মের সময়ই আমাদের প্রতিবেশি বৃহৎ বন্ধু রাষ্ট্রটি হাঙ্গরের মতো প্রায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
৬। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান শেষে জেনারেল অরোরা কলকাতায় ফিরে যান। একে খন্দকারও কলকাতায় যান। এমনকি কর্নেল ওসমানীও সিলেট থেকে কলকাতা যান। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর একে খন্দকার ঢাকা আসতে চাইলেও নিরাপত্তার অজুহাতে তাকে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি একই অজুহাতে রাজনৈতিক নেতাদেরও দ্রুত ঢাকায় ফিরতে দেয়া হয়নি। বেশ কয়েকদিন পর তারা সবাই ঢাকায় ফিরে আসেন।
৭। যা হোক, এসবই ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। আমাদের এ কে খন্দকার এই ইতিহাসেরই অংশ। আজ তার প্রয়াণ দিবসে এই সমর নায়কের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।
ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ
বাংলা বিভাগ
পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ, পাবনা।





