বাঙালি মুসলমানদের  দাসত্ব মানসিকতা টিকিয়ে রাখছে কারা!  

বাঙালি মুসলমানদের দাসত্ব মানসিকতা

বাঙালি মুসলমানদের  দাসত্ব মানসিকতা টিকিয়ে রাখছে কারা!  

মোশাররফ হোসেন মুসা

গত ২৮ ফেব্রয়ারি’২৫ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের অনুরোধে সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডর প্রোগ্রাম উপলক্ষে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ভিসি, দুই প্রোভিসি, পাকিস্তান উচ্চ শিক্ষা কমিশনের পরিচালক, পাকিস্তান হাই কমিশনের কাউন্সিলর, হাই কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক এবং শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী  উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে হাই কমিশন থেকে আগত কর্মকর্তারা বলেন- পাকিস্তানে ১৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে পাঁচ’ শ জন শিক্ষার্থীকে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ দেয়া হবে। তারা এসব  বিষয়ে আবেদন করার নিয়ম এবং  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ও পরিবেশ বর্ণনা করেন। এ উপলক্ষে সিনেট ভবনের উত্তরদিকে ১৫ টি স্টল করে শিক্ষা মেলার আয়োজন করা হয়।

বড় পর্দায় পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা,  বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির নৃত্য ও লোকো গান, মসজিদ, মন্দির,  গীর্জা, প্যাগোডার ছবি প্রদর্শন করা হয়। পাকিস্তান হাই কমিশন থেকে আগত কর্মকর্তারা শুধু শিক্ষা বিষয়ে কথা বললেও ভিসি, প্রোভিসিগণ বলেন অন্য কথা। যেমন; একজন ভিসি বলেন- গত ফ্যাসিস্ট সরকার দুই দেশের ভাতৃত্ববোধকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। জুলাই বিপ্লবে সেই বিচ্ছিন্নতা দুর হয়েছে’ । আরেকজন প্রোভিসি বলেন- আমাদের একই দেহে দুটি হাত ছিল। ৭১ সালে ইন্ডিয়া একটি হাত কেটে দিয়েছিল’। ভিসি বলেন- প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময়  পাকিস্তান জাতীয় সংগীত শুনেছি । তাছাড়া বাবার মুখেও  পাকিস্তান শাসনের কথা বহু শুনেছি। নিজে ইমরান খানের বহু  ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছি ‘।  তিনজন পাকিস্তানি মহিলা ছিলেন। তাদের বেশভুষা সাধারণ ও মুখ খোলা। এই প্রথম পাকিস্তানিদের খুব কাছ থেকে দেখলাম। উচ্চতা প্রায় ৭ ফুট,  নাক উচু, ঘাড় লম্বা ও গায়ের রং ফর্সা। সে তুলনায় বাঙালিরা খর্বাকায় ( উল্লেখ্য, ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়  পাক সেনারা বলতো – বাঙালিরা আধা মুসলিম  হ্যায়, ছোটা জাত হ্যায়, মাছলি খ্যয়তা হ্যায়)। এসব দেখে আমার মনে হয়েছে – বাঙালি মুসলমানেরা চারটি দেশের  দাসত্বের বোঝা বহন করছে। বৃটিশ, পাকিস্তান,  চীন ও আমেরিকা( আওয়ামী লীগ আমলে ছিল বৃটিশ, ভারত, আমেরিকা ও চীন) ।

পাকিস্তান তিনটি দেশের দাসত্বের বোঝা বহন করছে – বৃটিশ, আমেরিকা ও চীন। ভারত শুরুতে বৃটিশের দাসত্বের বোঝা বহন করলেও এখন কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে( মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন- বৃটিশরা যে লুটপাট করে গেছে , সেটা একদিন পুরণ হবে ;কিন্তু যে দাসত্বের মানসিকতা রেখে  গেছে,  সেটা কাটিয়ে উঠতে বহু কাল লেগে যাবে )।  আরও মনে হয়েছে – বড় দলগুলোর দ্বন্দ্বের পিছনে রয়েছে আত্ম পরিচয়ের সংকট। সবাই ‘অতি’ কিছু করতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকার সবকিছুতে অতি মাত্রায় বাঙালি হতে গিয়ে  বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। এমনকি,  তারা যদি লালন শাহ,  হাছন রাজা, শাহ করিম সহ লোকো কবিদের কথাগুলো ছড়িয়ে দিতে পারতেন, তাহলে আত্মপরিচয়ের সংকটটা বহুলাংশে দুর হতো। আবার যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে তাড়ালেন, তারা অতিমাত্রায় মুসলমান হতে গিয়ে বাঙালিত্বকে ত্যাগ করতে চাচ্ছেন। যেমন, ধর্মের নামে মাজার ভাঙচুর, আউল-বাউলদের মারধর উদাহরণ হতে পারে। 

পাকিস্তানে কায়েদে আজম, ফাতেমা জিন্নাহ, আল্লামা ইকবালের নামে বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাঁরা কি  ইসলাম ধর্ম প্রচার করে গেছেন?  অথচ আমাদের দেশে বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, লালন শাহ,  বিজ্ঞানী জামাল নজরল ইসলাম সহ বহু রাজনীতিক, কবি-সাহিত্যিকদের অবজ্ঞা করা হয়। আবার, আত্মপরিচয়ের সংকটের জন্য শুধু এ বাংলার মুসলমানদের এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। যেমন- বাংলাদেশের  প্রথিতযশা চিন্তক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর সংস্কৃতি কথায় বলেছেন- বাঙালি সংস্কৃতিতে হিন্দুদের অবদান বেশি, সেজন্য তারা আত্মঅহংকার করতেই পারে, সেটা মেনে নিতে হবে’। কিন্তু আমি তো দেখছি – আত্মঅহংকার এখন ঘৃণায় পর্যবসিত হয়েছে। মুষ্টিমেয় মানুষের ধর্মান্ধতার কারণে গোটা বাঙালি মুসলমানকে ঘৃণা করা শুরু হয়েছে । যেটি বহু আগে  আহমদ ছফা অভিযোগ করে গেছেন৷ কলকাতার বহু নাম করা কবি- সাহিত্যিকের লেখায় মুসলমান চরিত্র নেই। যেমন, কালবেলা উপন্যাস উদাহরণ হতে পারে ।

নক্সাল আন্দোলন নিয়ে লেখা উপন্যাসটিতে মুসলমান চরিত্র তো নাই-ই,   কোনো সাঁওতাল, নিম্নবর্গের মানুষের চরিত্রও নেই (  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও হুমায়ুন আহমেদের স্মরণ সভায় একবার  সমরেশ মজুমদার এসেছিলেন।  অনুষ্ঠান শেষে  চায়ের দোকানে এ বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি হা- না কিছু না বলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ)। অন্যদিকে বিভূতিভূষণের জন্মস্থানে প্রায় চল্লিশভাগ  মুসলিম ছিল। তিনি ইচ্ছে করলে একজন মুসলিম শিশুকে দূর্গার বান্ধবী করে দিতে পারতেন। এরকম বহু কারণে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের মাঝে  একটি বড় দেয়াল নির্মাণ হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ভাঙার জন্য দুই বাংলার মুক্ত রাজনীতিক, লেখক, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা রাখতে হবে। 

লেখক: গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।

SHARES

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

আরো পোস্টঃ