কঠিন কাঠ ও নরম স্নায়ু: এনসিপির অস্থির রাজনীতি

Dainik Pabna

কঠিন কাঠ ও নরম স্নায়ু: এনসিপির অস্থির রাজনীতি

ড. মো. আবু হাসান

১৯১৯ সালে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত এক ঐতিহাসিক বক্তৃতায় সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন এক গভীর ও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ‘রাজনীতি হলো শক্ত কাঠের বোর্ডে ধীরগতিতে ছিদ্র করার কাজ’; তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি শুধু কোনো সাহিত্যিক উপমা নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির এক ধ্রুব সত্য। রাজনীতি হলো আবেগের প্রতি অবিচলতা এবং ফলাফলের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে এক নিরন্তর ও সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করা। এই ভারসাম্য রক্ষা করা তখনই সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে, যখন কোনো বিপ্লবী আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ক্যারিশমার রুটিনাইজেশন’ বা সম্মোহনী শক্তির প্রথাগতকরণ। এই প্রক্রিয়ায় এক গভীর টানাপড়েন সৃষ্টি হয়: গণঅভ্যুত্থানের উত্তাপ থেকে অর্জিত বিপুল নৈতিক পুঁজি ধরে রেখে তাকে ধীরলয়ে প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদী কঠিন পথ এড়িয়ে রাজনীতিকরা তাৎক্ষণিক ক্ষমতার শর্টকাট খুঁজবেন?
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এই ওয়েবারীয় সংকটের এক নিখুঁত অথচ ট্র্যাজিক কেস স্টাডি। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং অলিগার্কিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা নতুন প্রজন্ম, যারা ট্যাগিং-বিরোধী চেতনা ও বৈষম্য দূরীকরণে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তারা অতি দ্রুত গঠন করে ‘জাতীয় নাগরিক দল’ (এনসিপি)। কিন্তু এই দ্রুত প্রতিষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়ায় তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো, যেমন- অন্তর্বর্তী সরকারে তড়িঘড়ি করে যোগদান এবং মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন, ওয়েবারীয় নীতি থেকে গভীর বিচ্যুতিকেই নির্দেশ করে। এটি স্পষ্ট করে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা উপেক্ষা করে ক্ষমতার সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথটিই বেছে নিয়েছে।
এর ফলে আমাদের সামনে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্লেষণী প্রশ্ন উঠে আসে: গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত শহীদের রক্ত, প্রজন্মের আত্মত্যাগ এবং গণমানুষের ভালোবাসার মতো বিপুল নৈতিক পুঁজি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অপরিপক্কতা ও কৌশলগত অধৈর্যের কারণে এত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেল? এনসিপির নেতৃত্ব রাজনীতিকে ওয়েবারীয় অর্থে মহান পেশা ও ব্রত (পলিটিক্স অ্যাজ এ ভোকেশন) হিসেবে সম্মান না করে, একে রূপান্তরিত করেছে নিছক নির্বাচনী সুযোগ সন্ধানে। যেখানে মন্ত্রিত্ব, সংসদে আসন এবং দলীয় ব্র্যান্ডিংই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম না হয়ে মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নিবন্ধে আমরা যুক্তি উপস্থাপন করব যে, এনসিপির বর্তমান অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিভাজন এবং তরুণ সমর্থকদের আস্থার দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা নিছক ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির এক গভীর কাঠামোগত সংকট। এই সংকট তৈরি হয়েছে নৈতিক পুঁজির প্রকৃত মূল্য ও তা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে না পারা, প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য অপরিহার্য ঐতিহাসিক সময়জ্ঞান না থাকা এবং ওয়েবার নির্দেশিত দায়িত্বশীলতার গভীর শাস্ত্রীয় ও নৈতিক অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থতা থেকে।

রাজনৈতিক পেশা ও নৈতিক দ্বৈততা
ম্যাক্স ওয়েবার (১৯১৯) তাঁর কালজয়ী বক্তৃতা ‘পলিটিক্স অ্যাজ এ ভোকেশন’-এ একজন সফল ও প্রকৃত রাজনীতিবিদের জন্য তিনটি অপরিহার্য গুণ চিহ্নিত করেছেন: প্যাশন বা গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ এবং দূরদৃষ্টি। ওয়েবারের মতে, রাজনীতিতে কেবল আবেগের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক পরিপক্কতার চাবিকাঠি হলো দুটি পরস্পরবিরোধী নৈতিক কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। তিনি একে চিহ্নিত করেছেন ‘বিশ্বাসের নৈতিকতা’ এবং ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ হিসেবে। বিশ্বাসের নৈতিকতায় একজন নেতা ফলাফলের চেয়ে আদর্শের বিশুদ্ধতাকে প্রাধান্য দেন, যা প্রায়শই বিপ্লবী আবেগের জন্ম দেয়। অন্যদিকে, দায়িত্বের নৈতিকতা দাবি করে সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী পরিণাম ও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কৌশলগত দায়ভার গ্রহণ করা। ওয়েবারের কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো, একজন প্রকৃত রাজনীতিককে এই দুই মেরুর সমন্বয় ঘটাতে হয়; যিনি নৈতিকভাবে দৃঢ় থাকবেন, আবার ফলাফলের দায়ও নেবেন।
রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ওয়েবারীয় এই কাঠামো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি ব্যাখ্যা করে কীভাবে একটি আন্দোলনের নৈতিক পুঁজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত হয়। এনসিপির বর্তমান সংকটকে এই তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা বিশ্বাসের নৈতিকতা থেকে দায়িত্বের নৈতিকতায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান থেকে অর্জিত বিপুল নৈতিক পুঁজি দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ার কাজে না লাগিয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষমতার শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি হলো ‘ক্যারিশমার রুটিনাইজেশন’ বা সম্মোহনী নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ব্যর্থতা (ওয়েবার, ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি, ১৯২২)। ফলে গণঅভ্যুত্থান সময়ের নৈতিক কর্তৃত্ব কৌশলগত অধৈর্যের কারণে দ্রুত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যা দলটিকে একটি কাঠামোগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অভ্যুত্থান ও ক্যারিশম্যাটিক অথরিটির রাজনৈতিক অর্থনীতি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় প্যারাডাইম শিফট নিয়ে আসে। একটি নির্দিষ্ট নীতি-সংস্কারের (কোটা প্রথা বিলুপ্তি) দাবি থেকে শুরু হয়ে এটি দ্রুত রাষ্ট্রের সামগ্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বসে। সরকারি বাহিনীর সহিংস দমনের মুখে সহস্রাধিক শহীদ এবং হাজারো আহতের রক্তস্রোত এই আন্দোলনকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নৈতিক আধিপত্য দান করে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের তাত্ত্বিক চশমায় এই মুহূর্তটিকে ‘ক্যারিশম্যাটিক অথরিটি’ বা সম্মোহনী কর্তৃত্বের সর্বোচ্চ শিখর হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
রাজনৈতিক অর্থনীতির লেন্স দিয়ে বিচার করলে, ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে এনসিপি বা ছাত্রনেতৃত্বের হাতে ছিল তিনটি উচ্চমূল্যের রাজনৈতিক সম্পদ বা ‘ক্যাপিটাল’: ১৮-৩০ বছর বয়সী প্রজন্মের নিঃশর্ত সমর্থন (সামাজিক বৈধতা), শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্রতা (প্রতীকী শক্তি) এবং দেড় দশকের স্বৈরাচার-বিরোধী বিজয়ের গৌরব (অ্যান্টি-অলিগার্কিক ম্যান্ডেট)। এই নৈতিক পুঁজি ছিল এমন এক বিরল সম্পদ, যা সঠিকভাবে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু ওয়েবার (১৯২২) সতর্ক করেছেন যে, ‘ক্যারিশমা সহজাতভাবেই অস্থির ও অস্থায়ী’ এবং একে দ্রুত ‘রুটিনাইজেশন’ বা স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে রূপান্তর করতে না পারলে তা মিলিয়ে যায়। এনসিপির ট্র্যাজেডি হলো, তারা এই বিপুল নৈতিক পুঁজি অর্জন করেছিল ঠিকই, কিন্তু একে রাজনৈতিক স্থায়িত্বে রূপান্তর করার জটিল প্রক্রিয়াটি অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে।

এনসিপির প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতি
সামাজিক আন্দোলন থেকে একটি টেকসই রাজনৈতিক দলে রূপান্তর এক অত্যন্ত জটিল প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডোনাটেলা ডেলা পোর্তা এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন: নেটওয়ার্ক থেকে হায়ারার্কি বা ক্রমউচ্চ কাঠামোর দিকে যাওয়া, ক্যারিশমা থেকে রুটিন বা প্রথাগত নিয়মে থিতু হওয়া, মোবিলাইজেশন বা জমায়েত থেকে গভর্ন্যান্স বা শাসনে উত্তীর্ণ হওয়া, এবং বিমূর্ত আদর্শ থেকে দৃশ্যমান নীতি বা পলিসিতে রূপান্তর (ডেলা পোর্তা ও অন্যান্য, ২০১৫/২০১৭)। এনসিপির উত্থান ও পতনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে তিনটি মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটিয়েছে।
প্রথম বিচ্যুতি (কাঠামোহীন ক্ষমতা ও স্বল্পমেয়াদী মোহ): দল হিসেবে এনসিপি গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল ম্যাক্স ওয়েবারের ‘শক্ত কাঠে ধীরগতিতে ছিদ্র করার’ নীতির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। অল্প দিনের মধ্যে বিপুল সদস্য সংগ্রহ এবং সারাদেশে কমিটি গঠন বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি ছিল চরম স্বল্পমেয়াদী লাভের মোহ বা ‘শর্ট-টার্মিজম’। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের কোনো আদর্শিক প্রশিক্ষণ ছিল না; তারা দলের নীতির চেয়ে নেতাদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিল।
দ্বিতীয় বিচ্যুতি (ক্ষমতার শর্টকাট ও পলিটিক্যাল রেন্ট-সিকিং): ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে এনসিপি নেতাদের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং মন্ত্রণালয় গ্রহণ ছিল কৌশলগতভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা যায় ‘পলিটিক্যাল রেন্ট-সিকিং’, যেখানে বিপ্লবী ত্যাগের নৈতিক পুঁজি খরচ করে তাৎক্ষণিক পদ বা সুবিধা আদায় করা হয়। ওয়েবার রাজনীতিতে ‘ভ্যানিটি’ বা আত্মম্ভরিতাকে মারাত্মক পাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এনসিপি নেতারা সরকারের বাইরে থেকে পরিবর্তনের গ্যারান্টর হিসেবে থাকার পরিবর্তে সরাসরি সরকারের অংশীদার হয়ে যান, ফলে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ভার তাদের কাঁধে চাপে।
তৃতীয় ও চূড়ান্ত বিচ্যুতি (আদর্শিক দেউলিয়াত্ব): এনসিপির কফিনে শেষ পেরেকটি ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের সিদ্ধান্ত। এটি ছিল তাদের নতুন বন্দোবস্ত নামক জন্ম-ন্যারেটিভের সাথে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা এবং ওয়েবারের ‘বিশ্বাসের নৈতিকতা’র চরম লঙ্ঘন, যা দলটির নৈতিক পুঁজি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

জামায়াত-জোট ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব
এনসিপির পতনের ইতিহাসে সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায় রচিত হয় ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর, যখন দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটের ঘোষণা দেয়। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করে জানান, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১-এর ভূমিকা আমাদের মূল্যবোধের সাথে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। রাজনৈতিক অর্থনীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রশ্ন জাগে: আওয়ামী লীগ বা বিএনপির জামায়াত-তোষণ আর এনসিপির জোট কেন এক নয়? উত্তর নিহিত ‘প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়’ বা ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিতে। ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর (আওয়ামী লীগ, বিএনপি) কয়েক যুগের ইতিহাস ও নিজস্ব ভোটব্যাংক থাকায় এমন জোট তাদের জন্য ক্ষমতা সংহতের কৌশল, যা অস্তিত্ব বিপন্ন করে না। কিন্তু নবীন এনসিপির একমাত্র সম্পদ ছিল নৈতিক পুঁজি। নতুন বন্দোবস্তের চেতনার বিপরীতে গিয়ে জামায়াতের সাথে হাত মেলানো তাদের জন্য কৌশলগত জয় নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট।
রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণে এই দুই ঘটনার মধ্যে তিনটি মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা বনাম অস্তিত্বের সংকট: ১৯৪৯ বা ১৯৭৮ থেকে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্র্যান্ডগুলোর সুদৃঢ় ভিত্তি, নিজস্ব ভোটব্যাংক ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। জামায়াতের সাথে জোট তাদের মূল পরিচয় বিসর্জন দেয় না; বরং এটি ক্ষমতা সংহতকরণ বা ভোটের অংকের সাময়িক কৌশল। সমর্থকরা জানে, এই জোট দলের আদর্শ গ্রাস করবে না। অন্যদিকে, এনসিপির মতো সদ্যজাত দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তি বা ভোটব্যাংক নেই; একমাত্র পুঁজি ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের নৈতিকতা। সুবিধাবাদী রাজনীতির বিপরীতে জন্ম নেওয়া এনসিপি জামায়াতের সাথে জোট করে নিজেদের ‘ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি’ হত্যা করেছে। দ্বিতীয়ত, পুঁজির ধরন (রাজনৈতিক বনাম নৈতিক): পুরনো দলগুলোর পুঁজি ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল’ (কর্মী, টাকা, জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রভাব)। জোটে কিছু ভোট যুক্ত হওয়ায় গাণিতিকভাবে তা লাভজনক হতে পারে। অন্যদিকে, এনসিপির পুঁজি ‘এথিক্যাল ক্যাপিটাল’ (শহীদের রক্ত, তারুণ্যের বিশ্বাস)। ১৯৭১-এর গণহত্যায় অভিযুক্ত জামায়াতের সাথে হাত মেলানো জেন-জি ভোটারদের সাথে প্রতারণা। ভোটের (রাজনৈতিক পুঁজি) আশায় এনসিপি নৈতিক পুঁজি (আসল সম্পদ) বিক্রি করে দিয়েছে। এটি একটি নেতিবাচক বিনিয়োগ। তৃতীয়ত, জন্ম-ন্যারেটিভের সাথে সাংঘর্ষিকতা: আওয়ামী লীগ বা বিএনপির জন্ম বা বিকাশে জামায়াত-বিরোধিতা একমাত্র চালিকাশক্তি ছিল না। কিন্তু এনসিপির জন্ম হয়েছে জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। জামায়াতের ইতিহাস ও রাজনীতি এনসিপির ফেরি করা ‘নতুন বন্দোবস্তের’ মূল্যবোধের পরিপন্থী। চব্বিশের শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কথা বলে একাত্তর-বিরোধী শক্তির সাথে হাত মেলানো জনগণের কাছে ভণ্ডামি হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। এটি ওয়েবারের বিশ্বাসের নৈতিকতার চূড়ান্ত লঙ্ঘন।

ওয়েবারীয় ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক পুনর্জন্মের শর্ত
ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর কালজয়ী বক্তৃতার শেষে সতর্ক করেছিলেন, ‘রাজনীতি কেবল তাদের জন্য, যারা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও বলতে পারে; তবুও! তবুও! তবুও!’ তিনি জানতেন, বিপ্লবের আবেগঘন উষ্ণতার পরেই নেমে আসে ‘বরফ-শীতল অন্ধকার রাত্রি’; যেখানে কেবল তারাই টিকে থাকে, যারা ধীর ও কষ্টসাধ্য প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম দিতে প্রস্তুত। এনসিপির বর্তমান সংকট এই ওয়েবারীয় ট্র্যাজেডিরই এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।
এনসিপির সামনে এখন দুটি পথ খোলা। প্রথমটি হলো বিলুপ্তির সমতুল্য নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকার পথ, যেখানে তারা ইতিহাসের পাতায় কেবল ‘একটি প্রজন্মের অস্থিরতা ও দায়িত্বহীনতার আখ্যান’ হিসেবে বেঁচে থাকবে। দ্বিতীয় পথটি হলো ওয়েবারীয় পুনর্জন্ম। এর জন্য প্রয়োজন তিনটি কঠিন শর্ত পূরণ: তাৎক্ষণিক নির্বাচনী ফলাফল বা আসন সংখ্যার তোয়াক্কা না করে নৈতিকভাবে বিতর্কিত জোট থেকে স্বচ্ছ ও স্থায়ী বিচ্ছেদ; আগামী ৫ বছরের জন্য ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মী প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণে আত্মনিয়োগ; এবং বিশ্বাসের নৈতিকতা ও দায়িত্বের নৈতিকতার সেই কঠিন ভারসাম্য আয়ত্ত করা। রাজনীতি কোনো ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট নয়, এটি ম্যারাথন। এনসিপি যদি এই ধীর ও কঠিন পথ বেছে নিতে পারে, তবেই তারা হয়তো একদিন সেই ‘তবুও’ বলার সাহস অর্জন করবে এবং ইতিহাসে স্থান পাবে।


বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা, অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক
ইমেইল: hhafij@yahoo.com

 

SHARES

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

আরো পোস্টঃ